খাদ্য

খাবার আমাদের জীবনে অতি প্রয়োজনীয় একটি অধ্যায়। শিশু বয়স থেকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত প্রতিটি জীবের জীবন ধারনের জন্য খাবার প্রয়োজন। সৃষ্টির শুরু থেকে আমরা পরিচিত খাবারের সাথে। সময়ের সাথে সাথে এবং বিজ্ঞানের কল্যানে খাবারের ধরন প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। একটা সময় মানুষের কাছে খাবার মানেই ছিল শুধু জীবন ধারনের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তু। কিন্তু মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি এবং বিজ্ঞানের কল্যাণে আধুনিকতার ছোঁয়ায় খাবার হয়েছে লাইফ স্টাইল ও রূপের কারন। খাবার শুধুমাএ এখন জীবন ধারণের অধ্যায়ে থেমে নেই। খাবার থেকে এখন আমরা মনোনিবেশ করছি সুষম খাবারের দিকে।   

সুষম খাবার

সাধারণত ছয়টি পুষ্টি উপাদানের  সমন্বয়ে যে খাদ্য তালিকা তৈরি করা করা হয় তাকে সুষম খাবার বলা হয়। আমেরিকা এগ্রিকালচার ডিপামেন্টের মতে, সুষম খাবারের জন্য খাবারের পেল্টটি কে চারি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যাতে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ভিটামিনস্ -ও মিনারেলস্  সমৃদ্ধ খাবার গুলো রয়েছে। তাই বলা যায়, প্রতিদিন আমাদের সকল পুষ্টি গুন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে সাথে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি। কারণ আমাদের শরীরের ৭০ শতাংশই পানি।

সৌন্দর্যের জন্য সুষম খাবার

কথাটা শোনা মাএই আপনার নিকট একটু অদ্ভুত লাগতে পারে। কিন্ত কখনো ভেবে দেখেছেন কি নিজের সৌন্দর্য্য ধরে রাখার জন্য রূপচর্যা অনেক করেছেন। কিন্তু শরীরকে ভিতরকার অঙ্গ -পতঙ্গের সৌন্দর্যের জন্য সুষম খাবারের নিয়মটা কতটুকু খেয়াল রেখেছেন?

শরীরের আভ্যন্তরীণ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সম্পর্কে যদি সচেতন না হোন বাহিরের সৌন্দর্য্য কখনোই দীর্ঘ স্থায়ী হবে না। যতই দামী প্রসাধনী আপনি ব্যবহার করেন না কেন।

ত্বক ভালো রাখতে সবজি খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু আমরা সবাই জানি। কিন্তু খেতে তেমন আগ্রহী নয় কেউ। কারন সবজি খাওয়া অনেক কষ্টসাধ্য কাজ। আর পর্যাপ্ত পরিমান পানি না খাওয়ার কারণ তো রয়েছেই।

কেন প্রয়োজন সুষম খাবার সৌন্দর্যের জন্য

বর্তমান পৃথিবীতে ৭.৭ বিলিয়ন মানুষের বাস। আধুনিকতার ছোয়ায় আমরা কৃষিক্ষেএে অনেক অগ্রসর হয়েছি। শহরে জীবন অনেক পরিবর্তন এসেছে সাথে গ্রামেও। খাদ্যাভাসে সেই পরিবর্তনে ব্যাপক ছোয়া। কর্মব্যস্ত জীবনে বাহিরের মুখরোচক খাবার গুলো যেন আপন হয়ে উঠছে দিন দিন। যেমনঃ গত দুই -তিন বছর ধরে কফি শপে আড্ডা দেয়ার সংস্কৃতি বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে। কাজ শেষে একটু প্রশান্তির জায়গা হয়ে দাড়িয়েছে কফিশপ গুলো। এখানে তরুনদের আনাগোনাটায় বেশি। কিন্ত কফি পান করার একটা নিয়ম আছে। অতিরিক্ত কফি খাওয়ায় হাড়ে ক্যালসিয়াম শোষণে বাধা দেয়। ফলে হাড়ের ঘনত্ব হাস্র পায় সাথে বিভিন্ন রকম হাড় জনিত অসুখ দেখা দেয়।

আরেকটি উল্লেখ যোগ্য দিক ফাস্টফুড খাওয়ার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে করে অপুষ্টি জনিত রোগ গুলো বেশি দেখা যায় বর্তমানে। ফাস্টফুড অধিক খাওয়ার ফলে অতিরিক্ত ক্যালরি আমাদের শরীরে জমা হচ্ছে। আমেরিকার হার্ট এসোসিয়েশনের মতে, একজন মানুষের দৈনিক ১০০ -১৫০ ক্যালরি গ্রহন করা উচিত। কিন্তু ফাস্টফুডের মাধ্যমে তার চেয়ে অতিরিক্ত ক্যালরি আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। এর ফলে স্থুলকায় থেকে শুরু করে চোখের সমস্যা, ত্বকের -চুলের প্রায় সব দিকে আমরা,সমস্যা ভোগ করছি বর্তমানে । যেমন একটি সফট ড্রিংকসে ৩৯ গ্রাম সুগার পাওয়া যায়। বলা যায় যা ৮ চা-চামচ চিনির সমান এবং যা থেকে ১৪০ গ্রাম ক্যালরি পাওয়া যায়।

এখন প্রশ্নটি হচ্ছে সুন্দর ত্বকের অধিকারী আমরা সবাই হতে চায় কিন্তু এর বিপরীতে আমরা শরীরকে কি ধরনের পুষ্টি প্রদান করছি?

বিষয়টি নিয়ে ভাবনার এখন সময় এসেছে।

কেন খাবেন সুষম খাবার সৌন্দর্যের জন্য

দেহের বাহিক্য সৌন্দর্যের সাথে সাথে অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে সুষম খাবারের উপর। সুষম খাবারের জন্য যে সকল খাদ্য উপাদান অবশ্যই আপনার খাবারের প্লেটে থাকতে হবে।

প্রতিদিনের সুষম খাবার থেকে বয়সভেদে যত টুকু ক্যালরি প্রয়োজন বয়স ভেদে তার একটি তালিকা তুলে ধরা হলোঃ

ছেলে

বয়স ২ থেকে ৮ বছরঃ ১০০০ – ১৪০০ ক্যালরি।

বয়স ৯ থেকে ১৩ বছরঃ ১৬০০- ২০০০ ক্যালরি।

বয়স ১৪ থেকে ৩০ বছরঃ ২৮০০ -৩২০০ ক্যালরি।

বয়স ৩০ উর্ধ্বেঃ ২০০০ -৩০০০ ক্যালরি।

মেয়ে

বয়স ২ থেকে ৮ বছরঃ ১০০০ -১৪০০ ক্যালরি।

বয়স ৯ থেকে ১৩ বছরঃ ১৪০০ – ১৬০০ ক্যালরি।

বয়স ১৪ থেকে ৩০ বছরঃ ২৪০০ ক্যালরি।

বয়স ৩০ উর্ধ্বেঃ২০০০ -৩০০০ ক্যালরি।

নিম্নে ৬টি খাদ্য উপাদানের সুষম খাদ্যের একটি তালিকা তুলে ধরা হলোঃ   

কার্বোহাইড্রেট / শর্করা     

শর্করা জাতীয় খাবার মূলত আমাদের শরীরে দেহের গঠন, বৃদ্ধি ও শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে। শর্করাকে পরিপোষক খাবারও বলা হয়। কার্বন, হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেনের সমন্বয়ে শর্করা উপাদান গঠিত। তাই শর্করা জাতীয় খাবার গুলো থেকে আমরা এই উপাদান গুলো পেয়ে থাকি।        

শর্করা জাতীয় খাবারের মধ্যে রয়েছে ভাত, লাল বা সাদা আটার রুটি, বার্লি, সিরিয়াল, চিড়া – মুড়ি, ভূটা, আলু। প্রতিদিন সুষম খাবারের তালিকায় ২২৫ গ্রাম থেকে ৩২৫ গ্রাম শর্করা থাকা প্রয়োজন। অর্থাৎ বয়স ভেদে খাবারের প্লেটের এক চর্তুথাংশ শর্করা জাতীয় আপনার পছন্দের খাবারটি রাখতে পারেন।

প্রোটিন

প্রোটিন দেহের বিভিন্ন অঙ্গের,মাংস পেশীর গঠন নখ- চুলের যত্নে  ও রক্ত কনিকা তৈরিতে সাহায্য করে। এজন্য প্রোটিনকে বলা হয় জীব শক্তির প্রধান উপাদান।

১গ্রাম প্রোটিন থেকে ৪ ক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। প্রানিজ প্রোটিনের মধ্যে দুধ ও ডিমকে বলা হয় আর্দশ খাবার। সেক্ষেত্রে প্রতিরাতে ১ গ্লাস ননী ছাড়া দুধ খাওয়া যায়। আর সকালে একটি সিদ্ধ ডিম হতে পারে আপনার সারা সকালের শক্তির সঞ্চারক। আর উদ্ভিদজ প্রোটিনের ক্ষেএে ডাল, শিমের বিচি বা সয়াবিন রাখতে পারেন। তাছাড়া দুপুরের খাবারে ভ্যারিয়েশন আনার জন্য এক টুকরো মাছ চর্বি ছাড়া বা দুই টুকরো মুরগী বা গরুর মাংস হাড় ছাড়া রাখা যায়। তবে এর ব্যতিক্রম হিতে বিপরীত হতে পারে।            

ভিটামিন    

ভিটামিন মানবদেহের অতি প্রয়োজনীয় একটি উপাদান যা অধিক মাএায় গ্রহণ করতে হয়। কারণ আমাদের শরীর দীর্ঘসময় ধরে রাখতে পারে না। ফলে সুষম খাবারের তালিকায় ভিটামিন জাতীয় খাবারের পরিমাণ বেশি রাখতে। বিভিন্ন রকম ফ্যাট পরিপাকে সহয়তা করে।

প্রতিদিনের খাবারের প্লেটে চার ভাগের দুই ভাগ সবজি রাখা ভালো। সেক্ষেত্রে এক ভাগ সিদ্ধ সবজি এবং অন্য ভাগ কাচাঁ সবজি রাখা যায়। সিদ্ধ সবজিতে আলু, ব্রকলি, ফুলকপি, মিষ্টি কুমড়ো, কাচাঁ কলা আর শাকের ক্ষেত্রে পালং, লাল শাক, পুই শাক ইত্যাদি। কাচাঁ সবজির ক্ষেত্রে শশা, টমেটো, গাজর, লেটুস পাতা রাখা যায়। খাবারে ভিন্নতা আনতে  কাচা্ঁ সবজির জায়গায় ফল খেতে পারেন। মনে রাখতে হবে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার অবশ্যই প্রতিদিব খেতে হবে। মৌসুমী বা দেশী ফল গুলো ভিটামিনের ভালো উৎস। প্রতিদিনের খাবার তালিকায় আপনার পছন্দসই খাবার যোগ করে নিতে পারেন।

পানি

আমাদের শরীরের অতি প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। মানবদেহের ৬০ শতাংশ কার্যক্রম পানির উপর নির্ভরশীল। পানির কার্যকারিতা অনেক যেমন শরীরের  টিস্যু গুলো সতেজ রাখা, কিডনির ছাকন প্রক্রিয়া সাহায্য করা সহ প্রতিটি অঙ্গের কাজ সঠিক ভাবে পরিচালনা করতে পানি মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। ওজন কমাতেও পানির ভূমিকা অপরিহার্য।  

সুষম খাবারের তালিকায় অবশ্যই আপনাকে ১০ গ্লাস  নিরাপদ পানি প্রতিদিন পান করতে হবে। বাহিরে বের হলেও অবশ্যই পানির বোতল সাথে রাখতে হবে। সকালে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি এবং খাওয়ার আগে ও পরে নিয়ম করে পান করতে হবে।

নিয়মিত শরীরচর্চা                  

শুধুমাত্র সুষম খাবার নিয়ে সচেতন হলে হবে না। নিয়ম করে সকাল বিকাল হালকা শরীরচর্চা করতে হবে। অন্তত প্রতিদিন ৩০ মিনিট নিয়ম করে হাটতে হবে এতে শরীরের ক্যালরী ক্ষয় হবে এবং শরীরের মেটাবলিজম ঠিক রাখবে।     

সুষম খাবার এবং নিয়মিত শরীর চর্চা অনুসরণ করে চলে প্রতেক্যের সুস্থ জীবন যাপন করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে সুস্বাস্থ্য  সকল সুখের মূল।