প্রাণীজ আমিষের উল্লেখযোগ্য একটি উৎস, মুরগীর মাংস। ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও সাধ্যের টানাপোড়ন মানুষকে দেশি মুরগীর স্বাদ ভুলে ব্রয়লার বা ফার্মের মুরগীর মাংসের প্রতি অনুরক্ত হতে বাধ্য করেছে। খাসি ও গরুর মাংসের মাত্রাতিরিক্ত দাম ও অত্যাধিক কোলেস্টেরলের মাত্রার জন্য আজ ব্রয়লারই হয়ে উঠেছে খাদ্য তালিকায় মাংসের প্রধান উৎস। তরকারি, রোস্ট, ফ্রাই, গ্রিল কত ভাবেই না আমরা খেয়ে থাকি এই মুরগী, কিন্তু আমারা কি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারছি প্রোটিনের নামে দিন দিন কি পরিমাণ বিষ ঢুকে যাচ্ছে আমাদের শরীরে?

স্বাধীনতার পর থেকেই ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে পোলট্রি শিল্প এবং বর্তমানে বছরে গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ মাংসের যোগান আসে এই পোলট্রি ফার্মগুলো থেকেকিন্তু অতিরিক্ত উৎপাদন ও লাভের আশায় এই ফার্মগুলোতেই এখন চলছে ক্ষতিকর রাসায়নিক, ভ্যাকসিন ও এন্টিবায়োটিকের প্রয়োগ৬ পাউন্ড ওজনে পৌচ্ছাতে যেখানে একটি মুরগির স্বাভাবিক ভাবে ৭০ দিনের মত সময় লাগতে পারে সেখানে মাত্র ৪৭ দিনেই সমান ওজনের মুরগি বাজারে আনছে এইসব ব্রয়লার মুরগী ব্যবসায়ীরা। সম্প্রতি এনটিভির একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মুরগির খাদ্য হিসেবে ট্যানারির চামড়ার উচ্ছিষ্ট ব্যবহারের কথা, যাতে রয়েছে ক্রোমিয়াম ও ক্যাডমিয়াম নামক বিষাক্ত পদার্থ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ডাঃ আবুল হোসেনের গবেষণায় জানা যায় মুরগিকে এটি খাওয়ানোর ফলে আমাদের দেশে ২৫০ গ্রাম ব্রয়লার মাংসে প্রায় ৮৭ মাইক্রোগ্রাম ক্রোমিয়াম পাওয়া যায়, যেখানে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন বলছে মাত্র ৩৫ মাইক্রোগ্রাম ক্রোমিয়ামই শরীরের পক্ষে সহনশীল যদিও ক্রোমিয়াম ২৯০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ধ্বংস করা সম্ভব কিন্তু রান্নায় আমরা বড়জোর ১০০ থেকে ১৫০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা ব্যবহার করে থাকি, এমন অবস্থায় মুরগীর ভেতরে থাকা ক্রোমিয়াম রান্নার মাধ্যমেও নষ্ট করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। আবার, মুরগীর ওজন বৃদ্ধি ও সুস্থ্যতার জন্য চলে বিভিন্ন ঔষধ, স্টেরয়েড ও ভিটামিনের প্রয়োগস্টেরয়েড দিয়ে মুরগীর কিডনিকে নষ্ট করে দেওয়া হয় যাতে গায়ে জমতে থাকা পানি এর ওজন বাড়িয়ে দেয়মুরগির মাংসে আজকাল মাত্রাতিরিক্ত চর্বি বা কোলেস্টেরল থাকে যা দেহের চর্বিজাতীয় উপাদান ২২৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে।

পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলছে প্রতিনিয়ত মুরগীতে এন্টিবায়োটিকের সেবন। এই এন্টিবায়োটিক হয়ত মুরগী মৃত্যু হার কমাছে ঠিকই কিন্তু বাড়িয়ে দিচ্ছে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি। এনটিভি, যমুনা নিউজ, আরটিভি, ডিবিজি বাংলা নিউজ, সময় নিউজ ও বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা যেমন প্রথম আলো, জনকণ্ঠ, ডেইলি স্টার প্রভৃতি মিডিয়াগুলোতেও আলোচিত হচ্ছে এই বিষয়গুলি। এগুলো পর্যালোচনা করে জানা যায় যে নিয়মিত এই মাংস খাওয়ার ফলে মুরগীর শরীরের বিদ্যমান এন্টিবায়োটিকগুলো চলে আসছে আমাদের শরীরে। যার ফলে আমাদের শরীরের ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুগুলো হয়ে উঠছে আগের থেকে শক্তিশালী, গড়ে তুলছে এন্টিবায়োটিকের প্রতিরোধক। এর জন্যই ১৯৪০ সালে আবিষ্কৃত জনপ্রিয় এন্টিবায়োটিক পেনিসিলিন মাত্র ১০ বছরেই তার কার্যকারিতা হারিয়েছিল, টেট্রাসাইক্লোন ১৯৪৮ সালে এসে ২ বছরও টিকতে পারেনি। ইরিথ্রোমাইথিন-এর আগমন ১৯৫২ সালে, কিন্তু ১৯৫৫ সালের মধ্যেই এটির কার্যকারিতা নষ্ট হতে থাকে, পরবর্তীতে পেনিসিলিনের সহায়তায় ১৯৬০ সালে আসা মেথিসিলিনও ১ বছরের মধ্যে অকার্যকর হয়ে পড়ে। দেহে এন্টিবায়োটিকের কার্যকারিতার অভাবে পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ৭ লক্ষ মানুষ অকালে মারা যাচ্ছে যা আসলেই মানবজাতির জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর তথ্য। বিজ্ঞানিরা বলছেন ২০৫০ সালের মধ্যেই এন্টিবায়োটিক হারাতে পারে তার বাস্তব কার্যকারিতা

আজকাল প্রায়ই দেখা যায় এন্টিবায়োটিক খেলেও রোগ নিরাময় হচ্ছে না বরং দেখা দিচ্ছে নানান সাইড ইফেক্ট। কারনটা তখন না বুঝলেও এখন আর তা কারো অজানা নেই। মুরগিতে ব্যবহৃত এইসব এন্টিবায়োটিকের ফলে দিন দিন কমে যাচ্ছে শরীরের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা, ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কিডনি, লিভার, হার্টের মত শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো; আরো দেখা দিচ্ছে অন্ত্রের সমস্যা, নষ্ট হচ্ছে বডি সেল আর দেহে বাসা বাধছে ক্যান্সারের মত জটিল রোগ। সুস্থ্য ও পূর্ণবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে এর প্রভাব কিছুটা কম হলেও গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য এর ভয়াবহতা শিউড়ে ওঠার মত। গর্ভাবস্থায় ঐসব মুরগী নিয়মিত খেলে ভূমিষ্ট শিশু বিকলাঙ্গ, অপুষ্ট, মানসিক ভারসাম্যহীন হতে পারে। শিশুরা খেলে তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয়, শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, এমনকি তাদের কিডনি, পাকস্থলী, তন্ত্র, বডি সেল নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এটি বডি ইমিউনিটি কমিয়ে দেয় যার ফলে আজকাল অধিকাংশ বাচ্চারাই দুর্বলতা ও ঘনঘন অসুস্থ্যতার স্বীকার হচ্ছে।

দেশে দৈনিক চাহিদার ৩০ লাখ কেজি মাংসের ২০ লাখ কেজিই মেটায় পোল্ট্রি খামার। খামারিদের সরবরাহকৃত মুরগীর বর্জ্য ও নাড়ীভুঁড়ি মাছের খাদ্য এবং সার হিসাবেও উৎকৃষ্ট মানা হয়, কিন্তু যদি এইসব মুরগীই হয় বিষাক্ত তবে মাংসের সাথে সাথে মাছ, খাদ্যশস্য এবং শাক-সবজি হয়ে উঠছে যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। তাই মুরগীর এই দূষণ সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে। দেশের সাধারণ জনগন থেকে সরকার সবাইকেই অস্বাস্থ্যকর খাদ্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে, এদের কেনাবেচা বন্ধ করতে হবে এবং খাদ্য নির্বাচন করতে হবে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর কোন উৎস থেকে।