বিষাক্ত ও ভেজাল খাবারের শিকার আমরা !!! (Bad effect of Contaminated food in Bd) খাবার প্রতিটি জীবের বেঁচে থাকার সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। অন্যান্য জীবের মতো আমরা মানুষরাও সবথেকে বেশি সময় ও শ্রম খাবার যোগানের কাজেই ব্যয় করে থাকি। যেই খাবারকে ঘিরে এতো কষ্ট, এতো হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম, সেই খাবারই যদি হয় বিষাক্ত- তবে আমরা কি পুরোপুরিভাবে ব্যর্থ নই? শুধুমাত্র দেখতে সুন্দর হতে হবে বলেই আমাদের নিয়মিত খাবারগুলোতে বিষ মিশ্রিত করা হচ্ছে। আমাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আমদের মতো মানুষেরাই শুধুমাত্র টাকা আয়ের আশায়  প্রতিনিয়ত খাদ্যে বিষ ও ভেজাল মিশিয়ে যাচ্ছেন। মুলত যে খাবারে ক্ষতিকারক কেমিক্যাল এবং অণুজীবের অবস্থান লক্ষ্য করা যায় এবং মানুষকে অসুস্থ করে তোলে সে খাবারগুলো বিষাক্ত খাবার নামে পরিচিত। কি করে বাড়ছে বিষাক্ত খাবার? খাদ্য বিষাক্ত করনের কাজে মুখ্য ভুমিকা পালন করি আমরা মানুষরাই, এছাড়াও রয়েছে শিল্প-বর্জ্য ও বিষাক্ত পানি ইত্যাদি। লোভী খাদ্য প্রস্তুতকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সরাসরি তাদের উৎপাদিত বা প্রস্তুতকৃত খাদ্যে বিষ যেমন (বিভিন্ন রঙ, দ্রুত বরধিতকরন কেমিক্যাল ইত্যাদি) মিশিয়ে থাকেন। এছাড়াও শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন উপাদান যেমন আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, কপার, নিকেল, জিঙ্ক ইত্যাদি বর্জ্যে পরিণত হয়ে পানি ও মাটিতে মিশে বিষে পরিণত হয়। মাটি ও পানি উভয় পরবর্তীতে ফসল ও মাছকে বিষাক্ত করে তোলে। প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে আমাদের খাদ্যে বিভিন্ন জীব থাকে যা রান্নার সময় তাপের মাধ্যমে ধ্বংস হয়ে যায়। তাই কাঁচা খাবার গ্রহনের ক্ষেত্রে বিষাক্ত খাবারের ঝুঁকি বেশি দেখা যায়। কিছু লক্ষনঃ বাহিরের দিক থেকে খুবি আকর্ষণীয় থাকার কারনে কোনভাবেই বোঝার উপায় থাকে না যে খাবারগুলোতে বিষ রয়েছে। রীতিমতো খাবার পরপরই সংক্রমণ না হয়ে ধীর গতিতে ঘাতকের মতো বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করে বিষাক্ত খাদ্য। লক্ষ্য করার মতো রোগগুলো হলও
o   বিভিন্ন ধরনের সংক্রমন
o   ডাইরিয়া
o   বমি
o   খাদ্যে অরুচি
o   হালকা জ্বর
o   দুর্বলতা
o   মাথা ব্যথা
o   ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তি
  ভালভাবে লক্ষ্য করে দেখুন, উল্লেখিত লক্ষণ গুলো আপনার মধ্যে থাকলে ধরে নিন আপনিও বিষাক্ত খাবারের আক্রমণের শিকার। কিছু ভিন্ন তথ্যঃ আমাদের অনেকেরই ধারনা যে, বাইরে থেকে বিভিন্ন রাসয়নিক মিশানোর কারনেই হয়তো খাদ্য বিষাক্তে পরিণত হয়।  সঠিক নিয়মে খাদ্য রেফ্রিজারেট করা, ও রান্নায় পরিপূর্ণ অসাবধানতার কারনেও খাদ্যে বিষক্রিয়া হতে পারে। যেমন মুরগী, মাংস, সামুদ্রিক খাবার, ডিম, রান্না করা ভাত, দুধ এবং সকল ধরনের ডেইরি খাবার ইত্যাদি সঠিক উপায়ে রান্না না করার কারনে এতে অনেক জীবাণুর অস্তিত্য লক্ষ্য করা যায়। মুরগী রান্না করার ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখার মতো বিষয় হচ্ছে, মুরগিকে পর্যাপ্ত পরিমান তাপে রান্না করতে হবে যাতে তাপ মুরগির হাঁর পর্যন্ত পৌছায় এবং সর্বোচ্চ দুই দিনের জন্য রেফ্রিজারেট করা হয়। এর মধ্যবরতি পর্যায় মুরগী নামিয়ে খাবার প্রয়োজন হলে একবারের জন্য নামিয়ে ভালভাবে গরম করে খাওয়া নিশ্চিত করতে হবে।অন্যথায় তা বিষক্রিয়ায় পরিণত হবে। একটি জিনিশ খুব ভালভাবে মাথায় রাখতে হবে যে, একি খাদ্য পুনরায় ব্যবহার করার ক্ষেত্রে তা পরিপূর্ণ ব্যবহার সম্পর্কে যানতে হবে। হাত পরিষ্কারভাবে ধুয়ে, শুকনো কাপর দিয়ে শুকিয়ে নেয়ার কাজ নিশ্চিত করা গেলে খাদ্যের জীবাণু সংক্রামণ রোধ করা যায়। খাদ্য কি তবে এখন মৃত্যুর কারণ?? খাবার গ্রহনের মাধ্যমে আমরা জীবন ধারণ করি তবে এই খাদ্য আমাদের জীবন অবসানের কারণ হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষকের মতে, অতিরিক্ত পরিমাণে ফসল উৎপাদনে কীটনাশকের ব্যবহার,ঝুঁকিপূর্ণ পথ খাবার, খাদ্য সম্পর্কিত পর্যাপ্ত তথ্য ও ধারনা লখ্যাদিক মানুষকে অসুস্থতার পাশাপাশি মৃত্যুর দিকে ঢেলে দিচ্ছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা সবচাইতে বেশি মৃত্যু ঝুকিতে রয়েছে কারণ খুবি অল্প বয়সী হওয়ায় তাদের শরীর খাদ্যের বিষক্রিয়াকে কাঁটিয়ে উঠতে পারে না। পরিণতি হিসেবে, বিষাক্ত খাবার গ্রহনের কারনে তাদের অকাল মৃত্যু হয়। লক্ষ্য করার মতো বিষয় হচ্ছে, প্রতিদিন প্রায় ৩০০ থেকে ১০০০ রোগী শুধু মাত্র ভেজাল ও বিষাক্ত খাবার গ্রহনের কারনে পেটের পিঁড়া, ডাইরিয়া ও বিভিন্ন সংক্রামণ রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের শরণাপন্ন হন। খাদ্যের ভেজাল বা বিষক্রিয়ার কাজটি মুলত শুরুই হয় উৎপাদনের পর্যায় থেকে। স্বল্প পরিশ্রমে বিপুল পরিমাণে লাভের আশায়, তারা মূলত অতিরিক্ত পরিমাণে বিভিন্ন ফলন-বরধক ঔষধি ও প্রাণঘাতী কীটনাশকের ব্যবহার করে। চিকিৎসকেরা মনে করেন, মানব দেহের জন্য অতিরিক্ত পরিমানের এই বিষ শারীরিক বিভিন্ন রোগের পাশাপাশি, স্থায়ীভাবে দেহের বিভিন্ন অংশের ক্ষতি করে, যার শেষ পরিণতি ভয়ংকর মৃত্যু। আমরা আজ অনেক বেশি ব্যস্ততার মাঝে সময় কাটাই। বলা যায় মানুষ এখন অনেক বেশি যান্ত্রিকভাবে জীবন যাপন করে। একটু সাচ্ছন্দে, নিশ্চিন্তে  জীবন-যাপনের জন্য আমরা এখন নিজেদের সাস্থ্যের প্রতি এখন অনেক বেশি অমনোযোগী। কোন বেলা খাচ্ছি, কি খাচ্ছি না তা এখন মনে করার মতো সময়টাও আমাদের নেই। যার কারনে আমাদের এখন প্রতিদিনই বাইরের খাবারের উপর নির্ভর করতে হয়। ঠিক এই সুযোগটাই হাতিয়ে নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। তৈরি খাদ্যের নামে তারা নানা রকমের  উচ্চ মাত্রায় রঙ ব্যবহার করেন,চোখে ভালো লাগানোর জন্য। আর এই রঙগুলো বেশির ভাগই মানব দেহের জন্য নয়। খাদ্যের চটকদার স্বাদ ধরে রাখার জন্য, তারা বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করেন যা মানব পাচকতন্ত্র হজম পর্যন্ত করতে পারে না। গবেষনায় দেখা যায়, পথ খাবার গ্রহন করার কারনে দৈনিক ৬ জনের মধ্যে ১ জন নিশ্চিতভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এই দিক থেকে ঐ পথ খাবার বিক্রেতারাই স্পষ্ট ভাষায় যানিয়ে দিচ্ছে যে, খাবারের স্বাদ,গন্ধ ও সুন্দরভাব বজায় রাখার জন্য তারা কিছু কৃত্তিম বিষয়ের উপর নির্ভর করেন। খাদ্যমানের কথায় তারা এক বাক্যে শিকার করেন যে, খাবারটি ঠিক কি পরিমাণে স্বাস্থ্যসম্মত তা তারা নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন না এবং তারা এইটাও শিকার করেন যে খাবারটিতে সাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে। মন থেকে দুঃখ অনুভব করলেও তারা পরিস্থিতির শিকার ও দৈনিক আয়ের পথ হিসেবে এটি করে যাচ্ছেন। বর্তমানে কোন খাবারটি ভেজাল থেকে মুক্ত? সত্য কথা বলতে এখন কোন খাবারি ভেজাল থেকে মুক্ত নয়। শিশু খাদ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন সবজি, মাছ, বেকারি খাবার এমনকি অসুস্থ রোগীর জন্য ঔষধ ও এখন ভেজাল থেকে মুক্ত নয়। আর প্রকৃতির এক অমুল্য দান ফুল ও ফল। এই ফুল ও ফলকেও বেশি সময় ধরে তাজা রাখার জন্য, বাইরে থেকে সুন্দরভাব বজায় রাখার জন্য ভিন্ন ভিন্ন ক্যামিক্যাল ও রাসায়নিকের ব্যবহার প্রতিনিয়ত করা হচ্ছে। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও খাদ্য ভেজাল নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা খুবি তৎপরতার সাথে খাদ্যের বিষক্রিয়া ও ভেজাল প্রতিহত করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার পরেও অসাধু ব্যবসায়ীরা নতুন নতুন উপায়ে তাদের অসাধু কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সত্যি বলতে, সবার আগে প্রয়োজন মানুষের মনের অবস্থার উন্নতি। আমাদের ভেতরের মানুষটি যখন সুস্থভাবে ভাবতে শিখবে কাজ করতে শিখবে, তখন আর কোন দ্বিতীয় পক্ষের প্রয়োজন হবে না আমাদেরকে সচেতনতা মূলক কথা বলার। অন্যদের ভালো রাখবো, সাথে সাথে নিজেরা ভালো থাকবো এইটাই হওয়া উচিত আমাদের জীবন কথা। শেষ পর্যন্ত আমরাতো সামাজিক জীব,তাই না?