নিম একটি ঔষধি গাছ। যার বৈজ্ঞানিক নাম  Azadirachta Indica. বহু আগে থেকে নিম গাছের পাতা, কাঠ, ফুল, ফল ও গাছের ছাল বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে প্রাচীন আয়ূর্বেদ চিকিৎসায়।

নিমকে বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ বলা হয়। বাংলাদেশ সহ ভারতে নিম গাছ প্রায় সব জায়গায় নিম গাছ জন্মায়। নিম গাছকে বলা হয় প্রাকৃতিক এন্টিসেপটিক। কারণ নিম গাছের ছাল পাউডার, তেল,পাতার রস, ফুল বা ফল সবই কিছুই কাজে লাগে বিভিন্ন ভাবে। নিম গাছের এতসব গুনাগুনের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিমকে “একুশ শতকের বৃক্ষ” বলে ঘোষনা করেছে।     

বর্তমান সময়ে নানা রকম ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে নিমের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী। তার মধ্যে একটি নিমের তেল।

নিমের তেল তৈরি করা হয় নিমের ফল থেকে। নিমের ফল দেখতে অনেকটা আঙ্গুর ফলের মতো। কাচা অবস্থায় ফলটির স্বাদ তেঁতো আর পাকাঁ ফলের স্বাদটি হয় মিষ্টি। নিমের ফল শুকিয়ে তেল তৈরি করা হয়।

নিমের তেলে বিভিন্ন রকম উপাদান রয়েছে। নিমের তেলের যে সকল গুনাবলি আছে তা হল এন্টিসেপটিক, এন্টিফ্যাঙ্গাল, এন্টিপায়ওরেটিক ও এন্টিহিস্টামিন। নিমতেলে আরও রয়েছে স্টেরলেরও, কেমপেস্ট্রল, বিটাসিটাস্ট্রল, সিকগমেস্ট্রল মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

নিম তেলে ফ্যাটি চেইন এসিড রয়েছে। যার মধ্যে লিওনিক এসিড ৬-১৬ শতাংশ,  ওলিক এসিড ২৫ ৫৪ শতাংশ, প্লামেটিক এসিড ১৬ – ৩৩ শতাংশ, স্ট্রেলারিক এসিড ৯-২৪ শতাংশ, আলপা লিওনিক এসিড ও প্লামিটোলিক এসিড সামান্য পরিমাণ।

ত্বকের যত্নে নিমের তেল

ত্বকের যত্নে নিমের তেল খ্রিস্টপূর্ব ১০০০০ বছর আগে থেকে ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানেও সবচেয়ে ত্বকের যত্নে  জনপ্রিয় নিমের তেল। নিমের তেল নন -টোক্সিক যা প্রাকৃতিক ভাবে নিরাপদ ত্বকের যত্নে। যথাঃ

১. ত্বকের বলিরেখা দূর করতে

নিম তেলে থাকা রিজেনিটিভ  প্রোপার্টিজ এবং ইমোনি উপাদান ত্বককে গভীর থেকে ময়েশ্চারাইজার করে। যার ফলে আপনার ত্বকের বলিরেখা দূর হয়ে মসৃণ ভাব চলে আসে।

২. শুষ্ক ত্বকে ময়েশ্চারাইজিং করে

নিম তেলে থাকা ভিটামিন – ই  এবং ইএফএস শুষ্ক ত্বককে ময়েশ্চারাইজ করে ত্বককের স্বাভাবিক সুস্থতা ফিরিয়ে আনে।  দ্যা ডিপার্টমেন্ট অফ বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড বায়োটেকনোলজি কওমি ইনক্রুমা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতে,  নিম তেল ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ যা শুষ্ক ত্বককে গভীর থেকে কোমল করে তুলতে সাহায্য করে।  

৩.এজমার সমস্যা হ্রাস করে

সেই প্রাচীনকাল থেকে  এজমার সমস্যায় নিমের তেল ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশেষ করে অতিরিক্ত শুষ্কতার ফলে ত্বক ফেটে যায়। দীর্ঘকাল এই সমস্যার ফলে ত্বকে এজমার সমস্যা দেখা দেয়। আরও দেখা যায় ত্বকেরর্্যাশ। এসকল সমস্যা থেকে মুক্তি দিবে নিয়মিত নিম তেলের ব্যবহার।

৪.সোরিয়াসিস (Psoriasis)  দূর করে

সোরিয়াসিস একটি মারাত্নক ত্বকের সমস্যা যার ফলে আপনার ত্বককে রোদে পোড়া মতো দেখায়। এই রোগের লক্ষণ হচ্ছে ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া এবং কালচে ভাব ধারণ করে। নিমের তেলে থাকা ভিটামিন – ই এই রোগে অনেকটা প্রভাব কম করে। তাছাড়া এন্টিব্যাকটেরিয়াল প্রোপর্টিজ ত্বকে যে সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করে ৷

৫.ত্বকের চুলকানো ভাব কমানো    

আমরা প্রায়শ ত্বকের এই সমস্যাটির সম্মুখীন হয়। বিশেষ করে গরম কালে অতিরিক্ত ঘামের কারণে ব্যাকট্রেরিয়া সংক্রমণ করে এই সমস্যাটি দেখা দেয়। নিম তেলে থাকা উচ্চ মানের   ফ্যাটি এসিড এবং ভিটামিন- ই ত্বকে রক্ষা করে এই সমস্যা থেকে এবং ত্বকের গভীর থেকে সুস্থ করে তোলে।

৬.ত্বকের ইনফেকশন প্রতিরোধ

নিমের তেলে থাকা এন্টিপ্রোপার্টিজ, যা ত্বকে যে কোন প্রকার ইনফেকশন থেকে রক্ষা করে। তাছাড়া ত্বকের ব্রণ সমস্যা যা মূলত ব্র্যাকটেরিয়ার সংক্রমনের জন্য হয়ে থাকে। তা প্রতিরোধের জন্য নিমের তেল বেশ উপকারী।         

৭.ত্বকের ক্ষত সারাতে

অনেক সময় ব্রনের ক্ষত দাগ গুলো পরবর্তীতে বেশ সমস্যার সৃষ্টি করে ত্বকে।  মুখের সৌর্ন্দয্য অনেকটা ভাটা পড়ে যায়। নিমের তেলে থাকা ফ্যাটি এসিড ব্রনের ক্ষত স্থান গুলো সারাতে সাহায্য করে। তাছাড়া ত্বকের বন্ধ লোমকূপের মুখ খুলতে সাহায্য করে। এতে আপনার ত্বকের অক্সিজেন সরবরাহ বেড়ে যায়। ফলে ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়।  

৮.ত্বকের কন্ডিশনার

নিমের তেল ত্বকের ডিপ ময়েশ্চারাইজিং কাজটি করে থাকে। প্রাচীন আয়ূর্বেদে ত্বকের ময়েশ্চারাইজার হিসেবে নিমের তেল ব্যবহার করা হতো। নিমের তেলের হারবাল ময়েশ্চারাইজিং ফর্মূলা ত্বকের ফাটা ও ছূলী সমস্যা দূর করে ও ত্বককে ভালো ভাবে টোনিং করে থাকে।   

৯.ত্বকের ব্ল্যাকহেডস্ দূর করে

নিম তেলের নিয়মিত ব্যবহার ত্বকের ব্ল্যাকহেডস দূর করে। কখনো নিম তেল সরাসরি মুখে ব্যবহার  না করায় ভালো । ২-৩ ফোটা নিম তেলের সাথে সামান্য পানি মিশিয়ে নিয়মিত ব্যবহার করলে অনেকটা সুফল পাওয়া যায় ত্বকের ব্ল্যাকহেডস  কমানোর জন্য। 

১০. এন্টি এজিংগ সিরাম

নিমে তেল ফ্যাটি এসিড, ভিটামিন – ই,  ঙএন্টিঅক্সিডেটন এবং এন্টি ইনফ্লামাটরি প্রোপার্টিজ সমৃদ্ধ। যা ত্বককে বাহিক্য দূষনের ক্ষতিকারক প্রভাবের হাত থেকে  রক্ষা করে। নিমের তেলে আরও রয়েছে ক্যারটিনয়েড যা দ্রূত গতিতে ত্বকে বলিরেখার হাত থেকে রক্ষা করে।

১১.ত্বকের হাইপার – পিগমেনটেশন কমায়

নিমের তেল ত্বকের পিগমেনটেশন কমাতে দারুন কাজ করে। এটা ত্বকের অসামানঞ্জস্য রঙ তৈরি হওয়া কে প্রতিরোধ করে। সাধারণত মেলানিনের জন্য এই সমস্যা তৈরি হয়। ত্বকে এই মেলানিনের উৎপাদনকে ধীর গতি করে দেয় এবং একটা সময় তা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করে।  নিমের তেলের নিয়মিত ব্যবহার ত্বকে পিগমেনটেশনের থেকে দূরে রাখে।

চুলের যত্নে নিমের তেল

চুলের যত্নেও জুড়ি নেই নিমের তেলের। বহুকাল ধরেই চুলের যত্নে নিমের তেল ব্যবহৃত হচ্ছে। চুলের বিভিন্ন রকম সমস্যা দূর করে নিমের তেল,চুলকে করে তোলে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল।

১.খুশকি দূর করতে

খুশকি একটি বিরক্তিকর সমস্যা,সবার জন্য। সারা বছর কম বা বেশি আমরা এই সমস্যায় ভুগে থাকি। বিশেষ করে শীতের সময় বেশি প্রকোপ দেখা,যায় খুশকীর। সাধারণত মাথার ত্বক অতিরিক্ত মাএায় শুষ্ক হয়ে পড়লে খুশকির সমস্যা হয়।

নিম তেলের মধ্যে থাকা মেডিসিনাল প্রোপার্টিজ মাথার ত্বক সুস্থ রাখে এবং পি. এইচ  লেভেল তা বজায় রাখে। একটু লক্ষ্য করলেই দেখবেন, খুশিনাশক শ্যাম্পু গুলোর একটি উল্লেখযোগ্য উপাদান নিমের তেল। তাই বলা যায়, খুশকির সমস্যায় নিমের তেল অত্যন্ত কার্যকর।    

২.উকুন নাশক

আয়ূর্বেদ শাস্ত্রে  নিম তেলকে বলা হয়েছে প্রাকৃতিক উকুন নাশক। নিম তেলের এন্টিব্যাকটেরিয়াল প্রেপার্টিজ উকুনকে ধ্বংস করতে সাহায্য করে। রাতে শোবার আগে নিমের,তেল চুলের,গোড়ায় ম্যাসেজ করে। পরের দিন চুল শ্যাম্পু করলে। পার্ত্থক্যটা বুঝতে পারবেন।

৩.চুল লম্বা করার জন্য

চুল লম্বা করার জন্য নিমের তেলের ব্যবহার  আজকে থেকে নয়। বর্তমান সময়ে চুলের অন্যতম সমস্যার একটি হলো চুল ঠিক মতো বেড়ে না ওঠা । নিমের তেল চুলের গোড়া শক্ত মজবুত করে। চুলের প্রয়োজনীয় পুষ্টি যুগিয়ে মাথার ত্বক সুস্থ  রাখ। ফলে চুল বেড়ে ওঠে নিশ্চিত ভাবে।     

৪. চুল ভেঙ্গে পড়া রোধ করে

প্রতিদিন চুলের যত্নে আমরা নানা রকম ক্যামিকেল যুক্ত জিনিস ব্যবহার করছি। ফলাফল চুলের মাঝখান থেকে ভেঙ্গে পড়ে যায়।  নিমের তেল আপনার চুলকে এই সমস্যা থেকে রক্ষা করে এবং চুলকে লম্বা হতে সাহায্য করে।

৫.রুক্ষ চুলকে ময়েশ্চারাইজার করে

রুক্ষ চুলকে পুষ্টি যোগায় নিমের তেল। নিমের তেলের ডিপ কন্ডিশনিং রুক্ষ চুলকে  প্রানবন্ত করে তোলে। শ্যাম্পুর অতিরিক্ত ক্ষতিকারক ক্যামিক্যালের প্রভাব রুক্ষ চুলের জন্য খারাপ। এই  ক্ষতিকারক শ্যাম্পু করার সময় তিন – চার ফোটা নিমের তেল মিশিয়ে নিন। এতে রুক্ষ চুলের কন্ডিশনিংও হয়ে যাবে।   

পালিত পশুর যত্নে

আপনার শখের কুকুর বা বিড়ালের যত্নেও নিমের তেল ব্যবহার করতে পারেন। অনেক সময় বিভিন্ন রকম ইনফেকশন দেখা দেয় আপনার শখের প্রানীটির গায়ে।সেক্ষেত্রে ক্ষত স্থানে নিমের তেল লাগিয়ে দিন অনেকটা আরাম দিবে।        

বর্তমানে নিমের তেল শরীরের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন রোগের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। বিজ্ঞানীগন নিমের তেলের সংমিশ্রণে বিভিন্ন মেডিসিন ব্যবহার করেছেন।

নিমের তেলের উপকারীতা বহুমুখী। তবে এই ভেজালের  ভিড়ে পিওর নিমের তেল খুঁজে পাওয়া কষ্ট সাধ্য। মাই অর্গানিক বিডি আপনাদের সেবায় সর্বদা পাশে রয়েছে। পিওর নিম তেলের জন্য আমাদের ওয়েব সাইটটি ভিজিটি করুনঃ