রান্নার অপরিহার্য একটি উপাদান হচ্ছে তেল,বিশ্বের যেকোন দেশের তুলনায় বাংলাদেশের রান্নায় তেলের প্রয়োগটা একটু বেশিই হয়। সকালের নাস্তার পরোটা হোক বা রাতের টেবিলের মাছের ঝোল সব আইটেমেই থাকে তেলের উপস্থিতি। সয়াবিন, সরিষা, বাদাম, পামওয়েল, তিলের তেল, অলিভ ওয়েল তো রয়েছেই সাথে আয়েশি বাঙালির খাবারে ঘি এর উপস্থিতিটাও কিছু কম না।
তেলে ঝোলে বেড়ে ওঠা বাঙালিই আজ ভোজ্য তেল নিয়ে আছে দুশ্চিন্তায়। আমাদের দেশের ব্যপারিদের কাছে ভেজাল যেন একটি ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তারই ধারাবিকতা বজায় রাখতে তাই আজ ভোজ্য তেল ও ঘি তেও উপস্থিত ভেজাল। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ন্যাশনাল ফুড সেইফটি ল্যাবরেটরির প্রতিবেদনে বলছে বর্তমানে যে তেল ও ঘি আমরা খেয়ে থাকি তার ৫০ ভাগই নাকি ভেজাল। প্যাকেট করা স্বচ্ছ ও পরিষ্কার দেখতে তেলগুলো খালি চোখে দেখে ভেজাল বলবে এটা কার সাধ্য? তবে কিনা, এইসব তেলেই মিলছে চর্বিযুক্ত ক্ষতিকর ওলিইক এসিড। সরিষা ও সয়াবিনকে পরিমাণ বেশি দেখাতে এতে মেশানো হচ্ছে নিম্নমানের পাম স্টিয়ারিন নামক তেল, এই পাম তেল মূলত ব্যবহার করা হয় সাবান, পেট্রলিয়াম ও রেশম শিল্পে। এছাড়াও বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ যেমন কস্টিক সোডা, ইরুসিক এসিড, এলাইল আইসোথায়োসায়োনেট মেশানো হচ্ছে তেলে। ব্র্যান্ডের তেল হোক বা খোলা সব ধরনের তেলেরই একই হাল, দোকান বা রেস্টুরেন্টের বারবার ব্যবহৃত তেল রাসায়নিক ও বিভিন্ন রঙ দিয়ে বোতলে ভরে আবারও বানিয়ে ফেলা হচ্ছে নতুন তেল। গবেষনায় জানা যায় সয়াবিন তেলের ৮৭ শতাংশই ভেজাল বা অন্য তেলের মিশ্রণে তৈরি। সরিষার তেলও নয় ভেজালমুক্ত। যেকোন তেলকে কৃত্রিম রঙ, গন্ধ দিয়ে সরিষায় রুপান্তর করা হচ্ছে, ঝাঁঝ ভাব আনতে তাতে মরিচ ও পেয়াজের রসের সাথে ইরুসিক এসিড ও এলাইল আইসোথায়োসায়ানেট ব্যবহার করা হয়। আর তাই আজকাল সরিষার তেলের স্বাদ থাকুক বা না থাকুক, ঝাঁজ থাকে মারাত্মক কড়া। সয়াবিন তেলের মধ্যে অ্যালাইল আইসো থায়োসায়ান ইডের মিশ্রণে তা সরিষার তেল হয়ে যায় সহজেই, আর সরিষার রঙ আনতে টেক্সটাইলের রঙ তো রয়েছেই। বর্তমান সরিষার তেলের মোটামুটি ৮৪ ভাগকেই আপনি ভেজাল ধরে নিতে পারেন। আবার তেলের মধ্যে পোড়া মবেল যা কিনা যানবহন বা মেশিনে ব্যবহার করা হয় মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে তেলের সাথে। বিভিন্ন রেস্টুরেস্ট ও হোটেল মালিক স্বল্পমূল্যে পাওয়ায় এই তেল ব্যবহারে তেমন আপত্তি তুলছেন না। এইবার আসা যাক ঘি প্রসঙ্গে, গর্ভবতী মা ও শিশুর একটু বেশি যত্নের আশায় যে ঘি আপনি তুলে দিচ্ছেন তাদের পাতে তার শুদ্ধতা নিয়ে আর একটু ভেবে নিন। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এবং বিএসটিআই এর প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে ডালডা, আলু, সুজি, নারিকেলের খৈল, পাম ওয়েল দিয়ে ঘি বানাচ্ছে ব্যাপারীর। আবার গরুর দুধের ঘি বলে মহিষের দুধ দিয়ে বানানো হচ্ছে ঘি আর তাতে দেওয়া হচ্ছে টেক্সটাইলের রঙ যাতে সেটা গরুর দুধের ঘি এর মতই দেখায় আর সুঘ্রাণ আনতেও রয়েছে কেমিক্যালের প্রয়োগ।
এক তেলের সাথে অন্য তেলের মিশ্রণ করলে তেলের মধ্যকার উপাদানগুলো বিক্রিয়া করে আর তৈরি হয় ক্ষতিকর পদার্থে। যেমন, সরিষার তেলের সাথে নারকেল তেল দিলে তা হয়ে ওঠে বিপদপজনক, আবার পামের সাথে সয়াবিন বা খনিজ তেল মিশানো স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। একটি অসাধু চক্র বিদেশ থেকে নিয়ে আসছে এইসব খনিজ তেল, পশুর চর্বি আর সাবান তৈরির পাম ওয়েল আর বিনা ভাবনায় তা মিশিয়ে চলেছে তেলে . বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা সিটি করপোরেশনের যৌথ অনুসন্ধানে জানা গেছে ঠিক এমনি তথ্য। বেশির ভাগ ভেজাল তেলের রয়েছে উচ্চ মাত্রার এসিডিটি, ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় ১৩ টি ব্র্যান্ডের সয়াবিনের বোতলের ৫ টি তেই পাওয়া গেছে এমন এসিডিটি, অন্যদিকে সরিষার ১৯ টির মধ্যে ১৪ টিই ভেজালে ভরা। এইসব তেল পেটে গিয়ে তা দ্রুত রক্তে ছড়িয়ে পড়ে আর বাড়িয়ে দেয় রক্তের কোলেস্ট্ররাল। এই তেলে বিদ্যমান এলডিএল হার্ট ব্লকসহ হৃদপিণ্ডের নানা রকম ব্যাধি সৃষ্টি করে, কর্মক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়, ফুসফুসের রোগ সৃষ্টি করে, এর শেষ পরিনতি হিসেবে হার্ট এ্যাটাকে মৃত্যুর মত ঘটনাও ঘটায়। গ্যাস, পেট খারাপ, হজমশক্তি কমে যাওয়া, খাবারে অরুচির মত রোগের সাথে এগুলো কিডনি ও লিভারের মত শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশেরও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করে। বিশেষ করে গর্ভবতি মায়ের শরীরে এইসব তেল প্রবেশ করলে তাদের লিভারের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে, তার অনাগত শিশুর বিকাশ বাধাগ্রস্থ হতে পারে এমনকি গর্ভেই শিশু মৃত্যুবরণ করতে পারে। শিশুদের খাবার প্রতি অনীহা, পেটের অসুখ, লিভার বা কিডনির ক্যান্সারের জন্যও আপনি এই মিশ্রিত তেলকে দায়ী করতে পারেন দ্বিধাহীন ভাবে। পরিবার ও নিজেকে সুস্থ্য রাখতে তাই আজ থেকেই ভেজালের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিন, আশেপাশে ভেজাল সম্পৃক্ত কোন কর্মকাণ্ড দেখলে তা আইনশৃংখলা বাহিনিকে জানান আর খাদ্য সংগ্রহ করুন বিশ্বাসযজ্ঞ নিরাপদ কোন উৎস থেকে।
কৃতজ্ঞতায়ঃ কালের কন্ঠ, প্রথম আলো, এনটিভি, বাংলা নিউজ২৪, জাগো নিউজ২৪, যমুনা টিভি।

Website | + posts
Cart
  • No products in the cart.